বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ১৯ নভেম্বর ২০১৯

সিলেট জেলা

ক ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থাপত্যঃ

১. আলী আমজাদের ঘড়িঃ

সিলেট নগরীর প্রবেশদ্বার সুরমা নদীর তীর ঘেঁষে কিন ব্রিজের ডান পাশে আলী আমজাদের ঘড়িঘর অবস্থিত। ঘড়ির ডায়ামিটার আড়াই ফুট এবং ঘড়ির কাঁটা দুই ফুট লম্বা। ১৮৭৪ সালে সুরমা নদীর তীরে এই ঐতিহাসিক ঘড়িঘরটি নির্মাণ করেছিলেন সিলেটের কুলাউড়ার পৃথিম পাশার নামজাদা জমিদার আলী আমজাদ খান। লোহার খুঁটির উপর ঢেউটিন দিয়ে সুউচ্চ গম্বুজ আকৃতির স্থাপত্য শৈলীর পরিচায়ক ঘড়িঘরটি তখন থেকেই আলী আমজাদের ঘড়িঘর নামে পরিচিতি লাভ করে। মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত  ঘড়িঘরটি সচল ছিল। বিরাট আকারের ডায়াল ও কাঁটা যুক্ত ঘড়িটির ঘন্টাধ্বনি শহরের বাইরে অনেক দূর থেকে শোনা যেত। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদার বাহিনীর গোলার আঘাতে ঘড়িঘরটি বিধ্বস্ত হয়। স্বাধীনতার পর পৌরসভা মেরামতের মাধ্যমে ঘড়িটি সচল করা হলেও কিছুদিনের মধ্যে ঘড়ির কাঁটা বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৮৭ সালে তৎকালীন চেয়ারম্যান আ.ফ.ম কামাল এ্যাডভোকেটের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ঢাকার একটি কোম্পানীর কারিগররা ঘড়িটি চালু রাখার জন্য রিমোট কন্ট্রোলের সাহায্যে ঘড়িটি সচল রাখার ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

 

২. রাজা গৌরগোবিন্দের দূর্গঃ

শহরের প্রান্তে সরকারী মুরারী চাঁদ কলেজের উত্তর পশ্চিমে এর অবস্থান। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী গৌরগোবিন্দ ছিলেন সিলেটের সবশেষ অমুসলিম রাজা। এ দূর্গটি তিনি নির্মাণ করেছিলেন। মাত্র ৩১৩ জন সাথী নিয়ে তাঁকে পরাজিত করে হযরত শাহজালাল সিলেট অঞ্চলে ইসলামের রাজনৈতিক বিজয়ের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন কিন্তু দূর্গটি একেবারেই বিলীন হয়ে গেছে।

 

৩. মণিপুর রাজবাড়িঃ

সিলেট ঈদগায়ের অদূরে এর অবস্থান। দেখতে একটি ছোট খাট বাংলোর মতো।  এর পাশে একটি মন্দির  আছে। সেখানে রাধাকৃষ্ণের পূজা হয়। বিশেষ করে রাস উৎসব ও ঝুলন যাত্রায় জাঁকজমকপূর্ণ ভক্ত সমাবেশ ঘটে।

 

৪. পুরোনো আদালতঃ

এটি একটি লম্বা টানা একতলা স্থাপনা। সামনে বারান্দা রয়েছে। বারান্দার ভারবহনের জন্যে সামনে এক সারি থাম আছে। এগুলো ঢালাই লোহায় তৈরী। ছাদ টিনের ছাউনি দিয়ে ঢাকা। একবোরেই সাদামাটা অথচ খ্রি: আঠার-ঊনিশ শতকে এটিই ছিল সিলেট তল্লাটের সবচেয়ে গুরূত্বপূর্ণ স্থাপনা।

 

৫. চাঁদনী ঘাটঃ

সুরমা নদীর পারে এর অবস্থান। এটি বেশ চওড়া এবং এতে মোট ২২টি ধাপ রয়েছে। উল্লেখ যে, বৃটিশ শাসনামলে একবার সিলেটকে আসামের অন্তর্ভূক্ত করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। ফলে তদানীন্তন গভর্নর নর্থব্রূক সিলেটে আগমন করেন। তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতেই এ ঘাট নির্মিত হয়েছিল। 

 

খ) ধর্মীয় পর্যটন পণ্যঃ

১. হযরত শাহ্ জালাল (র:) মাজাঃ

হযরত শাহ্ জালাল (র:) বাংলার একজন প্রখ্যাত সুফী দরবেশ ছিলেন। তার পুরো নাম শায়খ জালালুদ্দীন। তিনি সিলেটে সমাহিত আছেন। তাঁর নামানুসারেই এই মাজারের নামকরণ করা হয়।  মুসলমানদের সিলেট জয়ের সংগে হযরত শাহ্ জালাল (র:)-এর নাম জড়িত।  শহরের প্রধান আকর্ষণ সার্কিট হাউজ থেকে ৩ কি.মি দূরবর্তী হযরত শাহজালালের (খ্রি: চৌদ্দ শতক) মাজারে যাওয়ার জন্য শহরের কোর্টপয়েন্ট, জিন্দাবাজার ও চৌহাট্টা পেরিয়ে সুদৃশ্য মাজার গেটে পৌঁছাতে হবে। গেট পেরিয়ে কয়েক কদম এগিয়ে গেলে একটি মসজিদ। এর পেছনে একটি টিলা। উপরে উঠার জন্য একটি সিঁড়ি। সিঁড়ির উপর একটি এক গম্বুজ ইমারত আছে। এ মাজারকে কেন্দ্র করে মাজার এলাকায় অসংখ্য জালালি কবুতর, একটি পুকুর ও হযরত শাহজালালের সফরসঙ্গীদের মাজার রয়েছে। আরও রয়েছে একটি চিলখানা, ইয়ামেনী শাহজাদা আলীর কবর এবং সিলেটের মুসলিম প্রশাসক উজির মুক্তালিব খানের কবর। এছাড়া একটি ভবনে সংরক্ষিত এক জোড়া খরম, একটি তরবারী ও কয়েকটি থালাবাটিকে হযরত শাহজালালের স্মৃতি চিহ্ন বলে গণ্য করা হয়।   

 

২. হযরত শাহ্ পরান (র:) মাজারঃ

তিনি সুহরাওয়ার্দিয়া ও জালালাদিয়া তরিকার প্রখ্যাত সুফী। কথিত আছে তিনি শাহজালাল (রঃ) এর ভাগিনা এবং তার জন্ম ইয়েমেনে। তাঁর নামানুসারেই এই মাজারের নামকরণ করা হয়। সিলেট শহর থেকে প্রায় ৭ কি:মি: দূরে দক্ষিণগাছ পরগনায় খাদিম নগরে খানকাহ স্থাপন করে তিনি আধ্যাত্মিক সাধনা শুরু করেন। অদ্যাবধি তাঁর মাজার জিয়ারতের জন্য বহু লোক সমাগত হয়। রবিউল আওয়াল মাসের ৪, ৫ ও ৬ তারিখে তাঁর ওরশ হয়। তাঁর মাযারটি উঁচু টিলার উপরে  ইট দিয়ে বাধাঁনো ও দেয়াল ঘেরা অবস্থায় সযত্নে রক্ষিত। মাজারের সংগে উত্তর দিকে ‘আশাগাছ’ নামে একটি প্রাচীন গাছ রয়েছে। মাজারের পাশেই রয়েছে একটি প্রাচীন মসজিদ। ১৫০০ জন মুসলিম এখানে একত্রে নামাজ আদায় করতে পারে।

 

৩. ঈদ গাহঃ

এটি খুবই আকর্ষণীয় ঈদগাহ। পুরাতন কোর্ট ভবনের অদূরে একটি ছোট টিলার উপর এর অবস্থান। মোঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে ঐ অঞ্চলের ফৌজদার ফরহাদ খা এটি নির্মাণ করেছিলেন। এতে রয়েছে ছোট বড় ১১টি গম্বুজ ও ২৯টি সিঁড়ি। এই শাহী ঈদগাহ ময়দানে একদা উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শাহকত আলী, মহাত্মা গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেকে বক্তৃতা দিয়ে গেছেন।

 

৪. চৈতন্যদেবের মন্দিরঃ

স্থানীয়দের নিকট ‘ঠাকুরবাড়ি’ নামে পরিচিত। সিলেট শহর থেকে ১৭ কি.মি. দক্ষিণ পূর্বে গোপালগঞ্জ জেলার ঢাকাদক্ষিণ নামের ইউনিয়ন সদরে ৬০ মি. উঁচু পাহাড়ের পাদদেশে এ মন্দিরের অবস্থান। চৈতন্যদেব ছিলেন নবদ্বীপের ‘নদীয়া’ বাসিন্দা। এতদ অঞ্চলে তিনি গৌড়ীয় বৈষ্ণববাদ ও ভক্তিবাদের প্রবর্তক হিসেবে পরিচিত। ঢাকা দক্ষিণ নামক গ্রামটিতে তাঁর দাদী বাস করতেন। তাঁর সাথে সাক্ষাত করার জন্যেই চৈতন্যদেব একবার এ গ্রামে এসে কিছু দিন বাস করেছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর অনুসারীরা তার বসবাসের স্থানটিতে বর্তমান মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করে। প্রতি বছর চৈত্রের রবিবারে বারুণী ও রথযাত্রা এবং ফাল্গুন মাসের পূর্নিমায় তাঁর জন্মদিবস উপলক্ষে এক মেলা আয়োজন করা হয়। 

 

গ)   সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক পর্যটন পণ্যঃ

১. শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

১৯৮৬ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইন নং খঢঠওওখ বলে ১৯৮৭ সালে সিলেটের কুমারগাঁওতে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ১৪ ফেব্রুয়ারী ১৯৯১ সালে পদার্থ বিজ্ঞান, রসায়ন বিজ্ঞান ও অর্থনীতি এ তিনটি বিভাগ, ১৩ জন শিক্ষক এবং ২০৫ জন শিক্ষার্থী নিয়ে শিক্ষাক্রম শুরু করে। বর্তমানে এর ৫টি অনুষদ ও ১৩ টি বিভাগ, প্রায় ৩,০০০ শিক্ষার্থী, ২১৫ জন অনুষদ সদস্য এবং ২৫৪ জন সহায়ক কর্মচারী রয়েছে। 

 

২. এম. সি কলেজ (মুরারী চাঁদ কলেজ)

রায়নগরের জমিদার গিরিশচন্দ্র রায়ের দৌহিত্র মুরারী চাঁদ কর্তৃক সিলেট শহরে প্রতিষ্ঠিত একটি স্কুলকে ভিত্তি করে ১৮৯২ সালের ২৭ জুন ৪ জন শিক্ষক এবং ১৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে এই কলেজ যাত্রা শুরু করে। ১৮৯৭ সালে কলেজটির মূল ভবন ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে যায়। গিরিশচন্দ্রের মৃত্যুর পর ১৯০৮ থেকে এম.সি কলেজ একটি সরকারী কলেজ হিসেবে কাজ শুরু করে। বর্তমানে ১৩০ জন শিক্ষক ও ৬,০০০ শিক্ষার্থী নিয়ে কলেজটি দেশের অন্যতম বৃহৎ উচ্চ মাধ্যমিক কলেজে পরিণত হয়েছে। কলেজটি পাহাড়ের উপর দৃষ্টিনন্দন পরিবেশে ১১২ একর পরিমাণ জায়গা নিয়ে অবস্থিত। কলেজটি ২০০০ সালে দেশের সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় পুরস্কার লাভ করে। এম,সি কলেজের গ্রন্থাগার খুবই সমৃদ্ধ।  

 

ঘ)   বিনোদনমূলকঃ

১. জাকারিয়া সিটিঃ

হযরত শাপরানের মাজারের ১ কি.মি. দূরে দলইপাড়া গ্রামে এর অবস্থান। এটি একটি বেসরকারী পর্যটন কেন্দ্র। তিনটি টিলা জুড়ে এর অবস্থান। এর ভেতরে ফুলের বাগান, পারিবারিক বনভোজন কেন্দ্র, আঁকাবাঁকা খাল, ছোট পরিসরে সম্মেলন ঘর, সুইমিং পুল, জিমনেসিয়াম, খেলাধুলার স্পট, রেস্টুরেন্ট ও মোটেল রয়েছে। এরই অন্তর্ভূক্ত একটি রিসোর্টের নাম ‘জেস্ট হলিডে’।  আরও আছে এ্য্যপার্টমেন্ট।

 

২. কিনব্রিজঃ

সুরমা নদীর উপর স্থাপিত এ সেতুর দৈর্ঘ্য ৩৫০.৫ মি এবং প্রস্থ ৫.৪ মি। মাদারীপুর জেলার টেকেরহাট ব্রিজ যে পদ্ধতিতে নির্মিত হয়েছিল এটিও সেই একই পদ্ধতিতে নির্মিত। এর নির্মান কাজ ১৯৩৩ সালে শুরু হয়েছিল। তিন বছর অনবরত: নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাতায়াতের জন্যে উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল। তৎকালীন আসামের গভর্নর মাইকেল কিনের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়েছিল।

 

ঙ) নৌ -পর্যটনঃ

সুরমা নদীতে নৌ-পরিবহনঃ

বরাক নদী ভারতের আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলার মধ্যে দুটি শাখায় বিভক্ত হয়েছে। এর উত্তর দিকের শাখাটির নাম সুরমা।  বর্ষা মৌসুমে সুরমা বন্যাপ্রবণ নদী।  

 

চ) প্রাকৃতিকঃ

১. মালনিছড়া চা বাগানঃ

সিলেট বিমান বন্দরের অদূরে বিমান বন্দর সড়কের গা ঘেঁষে এ চা-বাগান। সম্ভবত এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও পুরাতন (ইং ১৮৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত) চা-বাগান। তাছাড়া বাগানের ভেতরে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত একাধিক স্থান। এর একপাশে একটি কমলালেবুর বাগান আছে। এটিকে পেছনে রেখে আরও কিছু দূরে রাখাতুয়া চা-বাগান অবস্থিত।

 

ছ) সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলকঃ

১. খাসিয়া উপজাতীর বাস ও বর্ণাঢ্য জীবনঃ

খাসিয়া আদিবাসী মঙ্গোলীয় বংশোদ্ভূত উপজাতি। এদের গাত্র হরিদ্রাভ, নাক-মুখ চেপ্টা, চোয়াল উঁচু, চোখ কালো ও ছোট টানা এবং খর্বকায়। এরা বাংলাদেশের অন্যতম মাতৃতান্ত্রিক গোষ্ঠী। এক কালে এই উপজাতিরা ছিল যাযাবর। তাদের সে স্বভাব সাম্প্রতিক কালেও লক্ষ্যণীয়। তাদের আবাস স্থল উত্তর-পূর্ব ভারত।  পাহাড়-টিলা, ঝোপজঙ্গল এদের পছন্দনীয় পরিবেশ। কাঠ বা বাঁশের মঞ্চের উপর বারান্দাসহ এরা কুঁড়েঘর বানায়। বারান্দাই বৈঠক ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বসত ঘরের সঙ্গেই রন্ধনশালা এবং সন্নিকটে থাকে পালিত শূকরের খোয়াড়। খাসিয়ারা গ্রামকে পুঞ্জি বলে। বাংলাদেশে তাদের আদি নিবাস বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তবর্তী সুনামগঞ্জ জেলায়, ভারতের মেঘালয় রাজ্যের খাসিয়া-জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে যা সমুদ্র সমতল থেকে ৯/১০ মিটার ঊর্ধ্বে অবস্থিত। এক কালে এখানে কয়েকটি পরগনা দখল করে কোন খাসিয়া সর্দার একটি রাজ্যও গঠন করেছিলেন। বিবাহ খাসিয়াদের নিকট একটি  ফরজ কাজ। আধুনিক সভ্যতার প্রভাবে খাসিয়া সমাজে ব্যাপক পরিবতন ঘটছে। মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা ও ক্রমশ শিথিল হচ্ছে।

 


Share with :

Facebook Facebook