বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ৬ জানুয়ারি ২০২০

যশোর জেলা

ক) ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্বিক, স্থাপত্য নির্দশনঃ

পর্যটন আকর্ষণের নাম ও বর্ণনাঃ

১. ভারত ভায়না (ভরতের দেউল) :

দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের একটি প্রত্নস্থল। কেশবপুর উপজেলা সদর হতে ১৯ কিঃমিঃ দক্ষিণ-পূর্বদিকে ভদ্রা নদীর তীরে এ প্রত্নস্থল অবস্থির। পার্শ্ববর্তী ভূমি থেকে ১২.২০ মিটার উঁচু  ও ২২৬ মিটার পরিধি বিশিষ্ঠ  এই ঢিবিকে সমভূমির মাঝে একটি উচ্চ টিলার মত দেখায়। দেউলটি গুপ্ত যুগে নির্মিত হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা এটি সম্ভবত হিউয়েন-সাং বর্ণিত সমতটের ৩০টি সংঘারামের একটি। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক দেউলটি খননের ফলে ৯৪টি কক্ষ দৃশ্যমান হয়। স্থাপনাটির চারপাশে বর্ধিতাকারে ১২টি কক্ষ ; বাকি ৮২টি কক্ষ ক্রমান্বয়ে উপরের দিকে উঠে গেছে। দেউলটির চুঁড়ায় ৪টি কক্ষ এবং পার্শ্বে ৮টি কক্ষ রয়েছে। স্থাপনাটির গোড়ারদিকে চারপার্শ্বে ৩ মিটার চওড়া রাস্তা রয়েছে। খননকালে এখানে পোড়ামাটির তৈরী নারীর মুখমন্ডল, দেবদেবীর নৃত্রের দৃশ্য সম্বলিত টেরাকোটার ভগ্নাংশ পাওয়া গেছে যা এ যাবৎ প্রাপ্ত টেরাকোটার মধ্যে বৃহৎ আকৃতির। তাছাড়াও এখানে পোড়ামাটির নারী মুর্তি, শিবলিঙ্গ,নক্সাকরা ইট, মাটির ডাবর ও  পোড়ামাটির গয়না ইত্যাদি পাওয়াযায়। ভরত-ভয়না, কাশিমপুর ও গৌরীঘোনা গ্রাম সহ প্রায় ৪ বর্গ কিঃমিঃ এলাকা জুড়ে এ প্রত্নস্থলটি বিস্তৃত।

২. মীর্জানগর হাম্মামখানাঃ

সম্রাট আওরঙ্গজেবের আমলে নুরল্লা খাঁ এ আঞ্চলের ফৌজদার নিযুক্ত হলে তিনি বুড়িভদ্রা নদীর দক্ষিণ পাড়ে ‘কিল্লাবাড়ি’ নির্মাণ করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ এ কিল্লার চারিদিকে সুবিস্তৃত পরিখা খনন করা, আট দশ ফুট উঁচু প্রাচীর বেষ্ঠিত করে এটাকে ‘মতিঝিল’ নামকরন করেন। এর একাংশে বতকখানা, হাম্মামখানা ও দূর্গের  পূর্বদিকে সদর তোরণ ছিল। বর্তমানে হাম্মামখানা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ঠ নেই। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা চার গম্বুজ ও সমসংখ্যক কক্ষ বিশিষ্ট এবং একটি কুপ সমেত হাম্মামখানাটি মোগল স্থাপত্য শৈলীর অনুকরণে নির্মিত। এর জানালাগুলো এমন উঁচু করে তৈরীযে এখানে অবস্থানকালে বাইরে থেকে শরীরের নিম্নাংশ দেখা যায়না। পূর্বপাশ্বে দেয়াল বেষ্টনীর ভেতর রয়েছে ৯ ফুট ব্যাসের ইটের তৈরী সুগভীর কূপ। এ কূপ থেকে পানি টেনে তুলে এর ছাদের দু’টি চৌবাচ্চায় জমা করে তা রৌদ্রের তাপে গরম করে দেয়াল অভ্যন্তরে গ্রথিত পোড়ামাটির নলের মাধ্যমে স্নান কক্ষে সরবরাহ করা হতো।

৩. হাজী মহসিনের ইমামবাড়া :

প্রতাপাদিত্য খ্যাত যশোর একটি প্রাচীন জনপদ। যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজের রয়েছে শতবর্ষের গর্বিত ইতিহাস। হাজী মহসিনের ইমামবাড়া এখনো দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে।

৪. চাঁচড়ার রাজবাড়ীঃ

যশোরের অন্যতম আকর্ষণ চাঁচড়ার রাজবাড়ী। এটি আঠারো শতকে নির্মিত হয়। চাঁচড়ার রাজবাড়ীর মধ্যে রয়েছে দশমহাবিদ্যা, দোচালা মন্দির, শিবমন্দির, গণেশ, সরস্বতী, কমলা, অন্নপূর্ণা, ভূবনেশ্বরী, ষোড়শী, মহাদেব, তারা আর বৈরবী, বাহাদুর পার্ক, অভয়নগর চৌগাছা। যশোরকে গাজীকালু চম্পাবতীর দেশ ও বলা হয়। ঝিকরগাছা যশোরকে গাজীকালু চম্পাবতীর দেশ ও বলা হয়। ঝিকরগাছার দুইমাইল পূর্বে লাউজানি ব্রাহ্মণনগর গ্রামে গাজীর বিখ্যাত দরগা অবস্থিত। এখানে দরগার পাশেই রয়েছে চম্পাবতীর পুকুর। মনিরামপুরে রয়েছে দর্শনীয় খেজুর বাগান।

৫. মধুপল্লী  (সাগরদাঁড়ি):

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের পরিবারের সাগরদাঁড়িস্থ আবাসস্থলটি ঘিরে মধুপল্লী স্থাপিত হয়ে । ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারী এ বাড়িতে মাইকেল মধুসূদন দত্ত জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পুর্বপুরুষগণ খুলনা জেলার অধিবাশী হলেও তাঁরা পরবর্তীতে সাগরদাঁড়িতে জমিদারি ক্রয় করে বেশ কিছু সুদৃশ্য অট্টালিকা ও অপূর্ব নির্মাণশৈলীর দেবালয় স্থাপন করেন। এ বাড়ির পূর্ব-পশ্চিম পার্শ্বে তার জ্ঞাতিদের বাড়ি ও জমিদারির কাছারি রয়েছে। পশ্চিম পার্শ্বের  বাড়িটিতে জন্ম নিয়েছিলেন মধুসূদনের ভ্রাতুষ্পুত্রী কবি মানকুমারী বসু। মধুসূদনকে ঘিরে এখানে গড়ে উঠেছে জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, সাগরদাঁড়ি পর্যটন কেন্দ্র ও মধুসূদন মিউজিয়াম। কপোতাক্ষ নদের পাড়ে কবির স্মৃতি বিজড়িত কাঠবাদাম গাছ ও বিদায় ঘাট পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণ করে।

৬. চৌগাছা:

যশোরের অন্তর্গত চৌগাছা গ্রামে বিষ্ণুচরণ বিশ্বাস ও দিগম্বর বিশ্বাস বাস করিতেন। তাঁহারা পূর্বে নীলকুটির দেওয়ান ছিলেন। নীলবিদ্রোহ এই চৌগাছা হতে সর্বপ্রথম জ্বলে উঠেছিল। প্রজার  “যোট” ভাঙ্গিবার জন্য নীলকরেরা আগে  গেলে, বিশ্বসেরা বরিশাল হতে লাঠিয়াল আসে। নীলকরের হাজার লোক এসে চৌগাছা গ্রাম সহসা আক্রমণ করে অনেক রক্তপাত ঘটে। গ্রামের মানুষ রাত্রির অন্ধকারে গ্রাম হতে গ্রামান্তরে ঘুরতো। তবে কোন নীল বুনেনি। এক সময় অসহায় গ্রামবাসী সর্বস্বান্ত  হয়ে পড়ে। প্রথম নীল-বিদ্রোহের এই চৌগাছাতে এখনও কুটিবাড়ী গুলো খাড়া আছে।

৭. ধীরাজ ভট্টাচার্যের বাড়িঃ

টেকনাফের মাথিনের কূপকে কেন্দ্র করে  ধীরাজ-মাথিনের প্রেম কাহিনী একটি কালজয়ী উপাখ্যান । দারোগা ধীরাজ ভট্টাচার্য কেশবপুর উপজেলার পাঁজিয়া গ্রামে ১৯০৫ সালে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি চট্টগ্রাম জেলার টেকনাফ থানায় কর্মরত থাকাকালে মাথিনের প্রেমে পড়েন ,তার প্রেম ও পুলিশ বিভাগের চাকরির ঘটনাবলি নিয়ে বিখ্যাত উপন্যাস “যখন পুলিশ ছিলাম” তিনি পুলিশের চাকুরি ছেড়ে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন এবং প্রায় দুইশত ছায়াছবিতে ও পঞ্চাশটির মতো নাটকে অভিনয় করেন। “যখন নায়ক ছিলাম” তার অপর কালজয়ী উপন্যাস। ১৯৫৯ সালে চলচ্চিত্র শিল্পের নায়ক ও সাহিত্যিক ধীরাজভট্টাচার্যের মৃত্যু হয়।

৮. মনোজ বসুর বাড়িঃ

কথাশিল্পী মনোজ বসু ১৯০১ সালের ২৫ জুলাই কেশবপুর উপজেলার ডোঙ্গাঘাটা গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তিনি বহুসংখ্যক উপন্যাস, গল্প,  ভ্রমণ কাহিনী, নাটক রচনা করেন। তিনি সাহিত্য একাডেমী পুরস্কার, শরৎচন্দ্র পুরস্কার, মতিলাল ঘোষ পুরস্কার পেয়েছিলেন। সুসাহিত্যিক মনোজ বসুর গ্রামের বাড়িটি সাহিত্য প্রেমীদের আজও আকর্ষণ করে।

খ) ধর্মীয়ঃ

পর্যটন আকর্ষণের নাম ও বর্ণনা

১. এগারটি শিব মন্দিরঃ

খূলনা শহরের সীমান্তবর্তী পয়োগ্রাম কসবা নামক স্থানে কয়েক কিলোমিটার উত্তরে অভয়নগর। চাঁচড়া রাজ পরিবারের অভয়া নাম্নী জনৈক রাজকন্যার নামানুসারে এ স্থানের নামকরণ করা হয়েছে। এখানে একটি রাজবাড়ী ও ১১টি মন্দির নির্মিত হয়েছিল। প্রাচীর বেষ্টিত এ বিস্তীর্ণ স্থানে রাজবাড়ী ও মন্দিরগুলির অবস্থান ছিল। রাজবাড়ী ও ১০ টি মন্দির প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। পূর্বভিটিতে অবস্থিত এখানকার সবচেয়ে বড় মন্দিরটি কিছূকাল আগেও অত্যন্ত জীর্ণ অবস্থায় টিকে ছিল। সবকটি মন্দির মিলিয়ে চকমিলানভাবে নির্মিত হয়েছিল। মন্দিরের সামনের দেয়াল অতি সুন্দর পোড়ামাটির চিত্রফলক দ্বারা অলংকৃত ছিল। অষ্টাদশ শতাব্দীর এ মন্দির এখন বিলুপ্ত প্রায়।

২. শেখপুরা মসজিদঃ

কেশবপুর হতে ১২ কিঃমিঃ দূরে সাগরদাঁড়ি যাওয়ার পথে একটি সমৃদ্ধ গ্রাম শেখপুরা। এ গ্রামে মোগল আমলের বেশ কিছু ইমারতের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। এর মধ্যে শেখপুরা মসজিদটি অন্যতম।  তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এ মসজিদটি মোগল স্থাপত্যরীতি অনুযায়ী নির্মিত। মসজিদটির পূর্ব পাশ্বের চার পিলারযুক্ত বারান্দাটি সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। যার পূর্ব পাশ্বের  চত্তরটি অনুচ্চ এক মিটার পুরু দেয়ালে ঘেরা। এ চত্তরের দক্ষিণ ও উত্তর দিকে দুইটি প্রবেশ পথ ছিল।

৩. দেবালয়  হরিহর  মন্দিরঃ

কেশবপুর উপজেলায় বালিয়াডাঙ্গা গ্রামে এটি অবস্থিত।

গ) উৎসব সম্পর্কিতঃ

পর্যটন আকর্ষণের নাম ও বর্ণনাঃ

১.মধূমেলাঃ

বাড়িতে কবির জম্মদিনে প্রতিবছর বিশাল মেলা অনুষ্ঠিত হয়। লাখ লাখ লোকের সমাগম হয় এই মেলায়। এই মেলাকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও আয়োজন হয়।

ঘ) প্রাকৃতিকঃ

পর্যটন আকর্ষণের নাম ও বর্ণনাঃ

১.কালোমুখ হনুমানঃ

কেশবপুর উপজেলার সাহাপাড়া, ব্রহ্মকাটি, রামচন্দ্রপুর, বালিয়াডাঙ্গা, মধ্যকূল এলাকায় প্রায় ৪০০ শত বিপন্ন প্রজাতির কালোমুখ হনুমান কে  দলবদ্ধভাবে বসবাস করতে দেখা যায়। এদের মুখমন্ডল কালো, লেজ শরীরের চেয়ে দেড়গুণ লম্বা, শরীর বাদামি রঙের লোমে আবৃত। নিরামিষভোজী এই প্রাণী রাতে উঁচু গাছের ডালে  রাত্রি যাপন করে। বিভিন্ন  ফলমূল, বাবলা গাছের কচিপাতা , বাদাম, রুটি, বিস্কুট এদের প্রিয় খাবার। ক্ষুধা পেলে এরা পথচারিদের কাপড়টেনে ধরে খাবার চায় এবং খাবার দিলে তা এগিয়ে এসে নিজ হাতে গ্রহণ করে। এরা খুবই অনুভূতিশীল । এদের আঘাত করলে প্রতিবাদ জানায় এবং প্রতিঘাতের মাধ্যমে প্রতিশোধ নেয়। প্রাপ্ত খাবার ভাগাভাগি করে খেতেও দেখা যায়। এক সদস্যের মৃত্যুতে অন্যরা মৃতদেহের পাশে বসে শোক প্রকাশ করে। অসুস্থ হলে স্থাণীয় পশু হাসপাতালে উপস্থিত হয়ে চিকিৎসা নেয়।


Share with :

Facebook Facebook