বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C
সর্ব-শেষ হাল-নাগাদ: ১১ জুলাই ২০২০

রাঙ্গামাটি জেলা

ক. ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক ও স্থাপত্য নিদর্শনঃ

১. চাকমা রাজার বাড়িঃ

চাকমা রাজা উপজাতীয়দের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত। চাকমা রাজবাড়ীতে অতীত চাকমা রাজবংশের বেশ কিছু নিদর্শন রয়েছে। এখানে চাকমা রাজা বাস করলেও সেই আগেরকার আমলের মতো রাজা নেই। রাজার বাড়ীর ঘাটে এলেই কিছুটা অন্যরকম বুঝা যায় কেননা বাজবাড়ি ঘাটটি বাঁধানো। রাজবাড়িতে ঢোকার মুখে বিস্তৃত জায়গা জুড়ে আদিবাসী বস্ত্রশিল্পের দোকান আর তাদের হাতের তৈরী বিভিন্ন আচারের সমারোহ। রাজার বাড়িতে ঢোকার মুখেই দৃষ্টি কাড়বে সিংহদ্বার। সিংহ মাথা সম্বলিত দু’টি অংশ। বিশাল টিনের বাড়ি। বাড়ীর দেয়ালে বিভিন্ন সময়ের রাজাদের ছবি টাঙ্গানো। উৎসবের সময় রাজারা প্রজাদের সাথে মিলিত হয়। এটি ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত।

 

খ. সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলকঃ

১. উপজাতী সংস্কৃতি যাদুঘরঃ

এই যাদুঘরে রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের কৃষ্টি-সংস্কৃতির প্রাচীন নিদর্শন। উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইন্সটিটিউটে এ যাদুঘর নির্মিত হয়েছে।

 

গ. বিনোদনমূলঃ

১. পর্যটন কমপ্লেক্স এলাকার ঝুলন্ত সেতুঃ 

বাংলাদেশের দূর-দূরান্ত থেকে আকৃষ্ট হয়ে পর্যটকরা প্রথমত যে কারণে রাঙ্গামাটি আসেন সেটি হলো পর্যটন কমপ্লেক্স এলাকার ঝুলন্ত সেতুটি দেখার জন্য। দুটি পাহাড়ের উপর সংযোগ ঘটিয়ে কাপ্তাই হ্রদের উপর ঝুলে আছে এই সেতু। বছরের দু-এক মাস এ সেতু হ্রদের পানিতে ডুবে থাকে। তবে শীতের মৌসুমে সেতু পার হয়ে পাহাড়ের চূড়ায় পিকনিক করে আগত দর্শনার্থীরা। সেতুটি পার হয়ে অন্য পাড়ে গেলেই প্রথমে দৃষ্টি কাড়ে অন্যতম পরিবেশ। সেতুটিকে কেন্দ্র করেই এখানকার আদিবাসী গোষ্ঠির জনগন তাদের ক্ষুদ্র পসরা সাজিয়ে বসে আছে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য। আরও রয়েছে বেশ কিছু খাবার দোকান।

 

২. প্যাদা টিং টিং

রাঙ্গামাটি শহরের অদূরে বালুখালীতে অবস্থিত পুরো সেগুন বাগানকে  প্যাদা টিং টিং নামে একটি বেসরকারী পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। “প্যাদা টিং টিং” শব্দের অর্থ পেটটি ভরে খাও। শুধু খাবারের জন্য নয়, এ স্থানটিকে পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য প্রকৃতিকে সুন্দর করে সুসজ্জিত করা হয়েছে। শুধু গাছগাছালিই নয়, এখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে বেশ কিছু বন্যপ্রাণী। ঢুকতেই প্রথমে দৃষ্টি কাড়বে ছোট একটি কুঁড়ে ঘর। এখানে রয়েছে আদিবাসীদের তৈরী পোশাক, লুঙ্গি, মাফলার, চাদর, গামছা, রূমাল আর ছোট একটি তাঁত। আদিবাসী রমনীরা তাদের নিজস্ব পোশাক পরে বিপনন করছে এসব সামগ্রী, এখানে উপজাতীয় ঐতিহ্যের খাবারসহ রকমারী খাওয়ার জন্য রয়েছে রেষ্টুরেন্ট ও থাকার জন্য রয়েছে উপজাতীয় ঐতিহ্যের টং ঘর।

 

৩. কাপ্তাই জল বিদ্যুৎ এলাকাঃ

পার্বত্য চট্টগ্রামের আঁকাবাঁকা পথে প্রবাহিত দূরন্ত কর্নফুলীর অবাধ্য স্রোত ধারাকে মানব কল্যানে নিয়োজিত করার জন্য ১৯৫১ সালে সামাজিক, অর্থনৈতিক, যোগাযোগসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়সমূহ বিবেচনায় এনে কাপ্তাইকে জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য নির্ধারণ করা হয়। ১৯৫৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে খরস্রোতা কর্নফুলীতে মূল বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এই জল বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি মূলতঃ একটি বহুমাত্রিক প্রকল্প। এ প্রকল্পের কারণে নৌ-পথ চলাচল সহজতর হয়েছে, মৎস্য সম্পদের উৎপাদন বহুগুনে বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বোপরি কাপ্তাই লেক ঘিরে গোটা প্রকল্প পরিগনিত হয়েছে।

 

ঘ. নৌ-পর্যটনঃ

কাপ্তাই লেকে নৌ ভ্রমণের জন্য উপযোগী জলযান রয়েছে এইসব জলযান দিয়ে অল্প খরচে অতি সহজেই আগত দর্শনার্থীরা লেকের মনোরোম দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।

 

ঙ. প্রাকৃতিকঃ

১. রাজবন বিহারঃ

বনরূপা শহর থেকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে পাহড়ের উপর প্রায় ৩৩.৫ একর জুড়ে বিস্তৃত এই রাজবন বিহার। বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের একটি অন্যতম তীর্থস্থান রাজ বনবিহার দেশের একটি প্রধানতম বৌদ্ধ বিহার। পার্বত্য বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু বনভন্তে এ বিহারে থাকেন। বিহারটিতে ৪টি মন্দির, তপঘর, বিশ্রামাবাস এবং তাবতিংশ আছে। এ ছাড়াও বড় আকারের একটি পিতলের বৌদ্ধ এর প্রধান আকর্ষন। বিহারটিতে সব সময়ই অসংখ্য বানরের ভিড় লেগে থাকে। এ রাজ বনবিহারে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয় যার মধ্যে কঠিন চীবর দানেৎসব সর্ববৃহৎ। প্রতি বৎসর দুই দিনব্যাপী কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানে লক্ষাধিক লোকের সমাগম ঘটে।

 

২. সুবলং ঝরণাঃ  

শহর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সুবলংয়ে ঝরণা স্পটকে একটি আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। বর্ষা মৌসুমেই ঝরণা গুলো জীবন্ত থাকে। শীতে ঝরণাগুলোতে খুব একটা পানি থাকে না বিধায় পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য ঝরণার চতুস্পার্শ্বে লাগানো হয়েছে বিভিন্ন ধরনের ফুলের গাছ, পাহাড়ে উঠার জন্য তৈরী করা হয়েছে রাস্তা। পাহাড়ের মাঝে মাঝে তৈরী করা হয়েছে বিশ্রামাগার এবং মূল ঝরণার পানি পাইপের মাধ্যমে আরো কয়েক জায়গার সৃষ্টি করা হয়েছে কৃত্রিম ঝরণা। ঝরণার পাশেই খোলা হয়েছে একটি রেস্টুরেন্ট এবং ঝরণার প্রবেশমুখেই পাহাড়ের ঢালুতে বাঁধ ও ছন দিয়ে বানানো হয়েছে উপজাতীয়দের ঐতিহ্যবাহী জুমঘর। আর জুমঘর এর পাশেই বানানো হয়েছে কয়েকটি হরিণের খাঁচা। সুভলং এলাকার যে আটটি ঝরণা রয়েছে তার মধ্যে শিলারডাক সবচেয়ে আকর্ষনীয়। তাই এই স্পটটিতে পর্যটকদের কাছে আকর্ষনীয় করে তোলার লক্ষ্যে এই স্পটকে পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত করা হয়েছে। 

 

৩. কাট্টলি হ্রদঃ

কর্নফুলী হ্রদের মধ্যবর্তী স্থান শুভলং থেকে লংগদুর মধ্যবর্তী কাট্টলিতে অবস্থিত হ্রদটি অতিক্রম করতে লঞ্চ কিংবা ছোট নৌ যানে দু’ঘন্টা সময় লাগে। এ হ্রদের মাঝখানে রয়েছে ছোট একটি দ্বীপ এবং দ্বীপে রয়েছে একটি বাজার। শীতকালে হাজার অতিথি পাখির এই হ্রদে আগমন ঘটে। কাট্টলী হ্রদে সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করা যায়। এ দ্বীপকে পর্যটকদের জন্য আকর্ষনীয়ভাবে গড়ে তোলা গেলে রাঙ্গামাটির পর্যটন শিল্প আরো বিকাশ লাভ করা সম্ভব। কিন্তু ঢেউয়ের আঘাতে হ্রদে মিশে যাচ্ছে এই দ্বীপটি। দ্বীপটির চারিদিকে রক্ষা প্রাচীর নির্মাণ, ডাক বাংলো তৈরী এবং স্কী খেলার ব্যবস্থা করা গেলে দেশী-বৈদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষন করা সম্ভব।

 

৪. সাজেক ভ্যালি

রাঙ্গামাটি জেলার সর্বউত্তরে ভারতের মিজোরাম সীমান্তে বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত অপরূপা সাজেক ভ্যালি বা সাজেক উপত্যকা যা বর্তমান সময়ে সকল বয়সী পর্যটকদের বিশেষ করে প্রকৃতিপ্রেমি এবং এ্যাডভেঞ্চারদের জন্য একটি জনপ্রিয় ভ্রমণ গন্তব্য। সাজেক হচ্ছে ৭০২ বর্গ কি.মি আয়তনের একটি ইউনিয়ন যা  বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন। এ ইউনিয়নে রয়েছে ‘রুইলু্ই’ এবং ‘কংলাক’ নামে দুটি পাড়া। স্থানীয় এ দুটি পাড়ার নামে হয়েছে দুটি পাহাড় - ‘রুইলু্ই’ যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭২০ ফুট এবং ‘কলাংক’ পাড়া ১৮০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। কলাংক হচ্ছে সাজেকের সর্বোচ্চ চূড়া। কর্ণফুলী নদী থেকে উদ্ভূত সাজেক নদীর নামে সাজেক ভ্যালীর নামকরণ করা হয়েছে। সাজেক ভ্যালিকে রাঙ্গামাটির ছাদ বলা হয়। সাজেকে লুসাই, পাংখোয়া এবং ত্রিপুরা উপজাতি বসবাস করে। সাজেক ভ্যালির শেষ সীমনয়ায় কলংক পাড়া গ্রাম যেখানে রয়েছে লুসাই জনগোষ্ঠির বসবাস। এ গ্রাম থেকে কর্ণফুলী নদীর উৎপত্তিস্থল ভারতের লুসাই পাহাড় দেখা যায়।

 

সজেকের সারি সারি সবুজ পাহাড় আর শুভ্র মেঘের ভেলার অবগাহন আপনাকে রোমঞ্চিত করবেই।  কখনো হঠাৎ গরম অনুভব করবেন আবার পরক্ষণেই মেঘের ঘন কুয়াশার চাদরে ঢেকে যাবে আপনার চারপাশ। মেঘের অবগাহনে আপনার শরীর শীতল হয়ে যাবে। এখানে একইদিনে প্রকৃতির বিভিন্ন রকমের রূপ অবলোকন করা যায়। সাজেকের নৈসর্গিক দৃশ্য আর পাহাড়ে পাহাড়ে মেঘের উড়াউড়ি আপনাকে মুগ্ধ করবে। সাজেকে হ্যলিপেড থেকে সকাল বেলার সূর্যোদয় এবং বিকালের সূর্যাস্ত পর্যটকদেরকে উপহার দেয় অনুপম সৌন্দর্যসম্ভার। রাতের মেঘমুক্ত আকাশের তারার রাজ্যে আপনার হারিয়ে যেতে নেই কোন মানা। বছরের যে কোন সময় আপনি সাজেক যেতে পারেন। তবে বর্ষা, শরৎ ও হেমন্তকালে সাজেকের মেঘের সাথে পাহাড়ের উষ্ণ আলিঙ্গনের মাতোয়ারা বেশি দেখা যায়।

 

সাজেক যদিও রাঙ্গামাটি জেলায় অবস্থিত, খাগড়াছড়ি জেলার থেকে এর দূরত্ব কম এবং যাতায়ত ব্যবস্থাও ভালো। খাগড়াছড়িতে এর দূরত্ব ৭০ কিলোমিটার এবং দীঘিনালা থেকে ৪০ কিলোমিটার। এখানে উল্লেখ্য যে, সাজেক যেতে হলে অবশ্যই বাঘাইহাট পুলিশ এবং আর্মি ক্যাম্প থেকে অনুমতি নিতে হয়। সাজেকে আবাসন এবং আহারের জন্য বেশ কয়েকটি উন্নতমানের রিসোর্ট এবং রেস্তোরাঁ রয়েছে।  


Share with :

Facebook Facebook